মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল, ২০২৪

কবি কাজী নজরুল ইসলাম

স্বাধীনতাও অধিকার আদায়ে  কবি নজরুলের নবযুগ,ধুমকেতু,লাঙ্গল,পত্রিকার অবদান 
-মাহমুদুল হাসান নিজামী 

১৯২০ সালে বিশ্বযুদ্ধ শেষে বৃটিশ সেনাবাহিনী থেকে ফিরেই কবি নজরুলের  সাংবাদিকতা ও কবিতার ধূমকেতুর আগমন ঘটে নজরুল জীবনে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী । তিনি একাধারে ছিলেন কবি, গল্পকার, প্রবন্ধকার , সঙ্গীতকার , সুরকার, নির্ভীক দেশপ্রেমিক এবং একজন একনিষ্ঠ সাহসী সাংবাদিক ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে করাচী তে বাঙালি পল্টন ভেঙে যাওয়ার পরে তিনি যখন কলকাতায় ফিরে আসেন তার কিছুদিন আগে থেকেই ‘সওগাত’ ও ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি ‘পত্রিকায় তাঁর ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী, ‘হেনা’, ঘুমের ঘোর , ইত্যাদি কয়েকটি ছোট গল্প ও কবিতা প্রকাশিত হয়। এবং এখানেই মহম্মদ নাসিরুদ্দিন , কমরেড মাওলানা মুজাফফর আহমেদ প্রমুখ সম্পাদকের সঙ্গে লেখক রূপে নজরুলের পরিচিতি গড়ে ওঠে ।জীবিকা অর্জন ও স্বাধীন চিন্তা প্রকাশের জন্য তিনি সাহিত্যের পাশাপাশি সাংবাদিকতাকেও পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন ।
বাংলা সংবাদপত্র জগতে কবি নজরুল ইসলামের সাংবাদিক হিসেবে বিশাল অবদান রয়েছে । তিনি এবং মোজাফফর আহমেদ যুগ্ম ভাবে সাংবাদিকতার সূচনা করেছিলেন ।নজরুল একদিকে যেমন শ্রমিক, কৃষক , সাধারণ মেহনতি মানুষের কথা বলেছেন অপরদিকে তেমনি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আদর্শকে তুলে ধরেছেন কবিতা ও সাংবাদিকতায়।
নজরুল ও মোজাফফরের যৌথ সম্পাদনায় ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয় ‘নবযুগ’ পত্রিকা ।সেখান থেকেই শুরু হয় কাজী নজরুল ইসলামের সাংবাদিক জীবনের হাতেখড়ি ।মাওলানা মুহাম্মাদ আলী ও শওকত আলীর নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে তখন দেশ ছিল টালমাটাল ।এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে  চুলচেরা বিশ্লেষণ ফুটে উঠেছে নজরুল ইসলামের সম্পাদিত নবযুগ পত্রিকায় । নবযুগ পত্রিকাতেই কবি নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যার প্রতিটি ছত্রে ছত্রে ছিল জ্বলন্ত দেশপ্রেম, আন্তর্জাতিক চেতনা এবং বিপ্লব বাদী চিন্তা । , ‘তুরস্কের বিপ্লব , ‘আয়ারল্যান্ডের  বিপ্লব  নজরুল ইসলামের প্রেরণারই উৎস ছিল  ।
নবযুগ পত্রিকার জনপ্রিয়তার আর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল নজরুলের অগ্নি ঝরা লেখা, আকর্ষণীয় হেডিং , বড় সংবাদ কে সুকৌশলে সংক্ষিপ্তকরণ এবং কোনো কোনো সংবাদের শেষে কাব্য ভাষায় মন্তব্য প্রকাশ ।নবযুগ পত্রিকায় ‘দেশের খবর’ , পরদেশপঞ্জী , ‘মুসলিম জাহান’ ইত্যাদি সংবাদ বিভাগ অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল ।
নজরুল একই সঙ্গে বিপ্লবী কবি এবং বিপ্লবী সাংবাদিকতার ভূমিকা পালন করে গেছেন  ।মুহাজিরিন হত্যার জন্য দায়ী কে’—–এই সম্পাদকীয় লেখার জন্য ব্রিটিশ সরকার নবযুগ পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করে ।
১৯২২ সালের ১১ই আগস্ট প্রকাশিত হয় নজরুলের দ্বিতীয় অর্ধ সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু ‘ । ইতিমধ্যে বিপ্লবী সাংবাদিক হিসেবে তিনি নন্দিত হয়েছেন ।এই পত্রিকা একই সঙ্গে বিপ্লবীদের এবং সাম্যবাদী চিন্তাধারার মানুষ জনের সমর্থন পেয়েছে ।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধূমকেতু তে বানীপাঠিয়েছিলেন এভাবে -
আয় চলে আয়রে ধূমকেতু ……
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
রবীন্দ্রনাথের প্ররনাকে শিরোধার্য করে নজরুল তাঁর লেখায় আগুন ঝরালেন এভাবে —–
“আমি যুগে যুগে আসিয়াছি পুন:/মহাবিপ্লব হেতু……..
মহাকাল ধূমকেতু ।”
নজরুল ধূমকেতুর সম্পাদকীয়তেই  পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী উত্থাপন করলেন —–“সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায় ।ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশ বিদেশের অধীনে থাকবে না।”
পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে ।আর বিদ্রোহ করতে হলে সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে, বুক ফুলিয়ে বলতে হবে —‘ 
নজরুল কবিতা লিখলেন  নির্ভয়ে বানীতে
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ ।’
ধূমকেতুর আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল সাম্প্রদায়িকতা ও সমাজবিরোধীতার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা । মুসলিম সমাজকে স্বাধীনতার মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য নজরুল ধূমকেতুর মাধ্যমে তাঁর কলম চালিয়েছিলেন ।
১৯২৫ সালের  ডিসেম্বর মাসে ‘লেবার স্বরাজ পার্টি ‘গঠিত হওয়ার পর নজরুলের  ‘লাঙ্গল ‘ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।সেখানে নজরুল ইসলামের বিখ্যাত সাম্যবাদী কবিতাগুচ্ছ প্রকাশিত হয় ।
রাজনৈতিক কারণে ‘লাঙল ‘পত্রিকা গণবানী’ তে পরিণত হয় ১৯২৬ সালের ২২শে আগস্ট ।নজরুল গণবানীর সম্পাদক ও লেখক ছিলেন ।এই পত্রিকায় নজরুলের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে লেখা কবিতা ‘মন্দির মসজিদ , ‘লাল নিশান , ‘ কান্ডারী হুঁশিয়ার ‘ ইত্যাদি প্রকাশিত হয়।
১৯২৭ সালে প্রকাশিত ‘সওগাত ‘ পত্রিকার নজরুল ছিলেন সাংবাদিক ও লেখক । ১৯৪১সালে প্রকাশিত তাঁর সর্বশেষ পত্রিকা ‘দৈনিক নবযুগের ‘ তিনি প্রধান সম্পাদক ও লেখক ছিলেন ।
‘নবযুগ, ‘ধূমকেতু , ‘লাঙল ‘ ‘গনবানী’ প্রভৃতি পত্রিকায় নজরুলের সাংবাদিকতা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে । জণজাগরণ ও শ্রমজীবী মানুষ কে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কাজীনজরুল ইসলামের সাংবাদিকতা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে ।সাহিত্যিক প্রতিভার মত নজরুলের সাংবাদিক প্রতিভাও ছিল অনেকটাই সংগ্রামী ।রাইটিং , রিপোর্টিং , সিলেকটিং , কাটিং , এডিটিং প্রভৃতি কর্মকৌশল তিনি সাংবাদিকতার শুরু থেকেই  করতেন  ।কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ করে সম্পাদকীয় কলমে তিনি এক নতুন রীতির প্রবর্তন করেন ।নজরুলের সাংবাদিকতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল সংবাদের নৈতিকতার প্রতি একনিষ্ঠতা।
‘নবযুগ’ পত্রিকাতে নজরুলের সাংবাদিক জীবনের হাতেখড়ি আর ‘দৈনিক নব যুগে ‘ তাঁর সাংবাদিক জীবনের শেষ ।দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে দীর্ঘ ৩৪ বছর নজরুলের নির্ঝর কন্ঠ  স্তব্ধ ছিল ।  অভিমানে তিনি নীরব রইলেন।
কবিতা সাংবাদিকতা দিয়ে তিনি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন